Prabhat Roy: মেয়ের ভালোবাসায় সেরে উঠেছেন বাবি, ফিরেছেন কাজে

একটা কথা আজকাল প্রায়শই শোনা যায়, ‘স্বার্থ ছাড়া কেউ কিছু করে না’। কথাটা আংশিক সত্য অবশ্যই। কিন্তু এটাও অস্বীকারের উপায় নেই, যে কথাটা আক্ষরিক অর্থেই ‘আংশিক’ সত্য। নিঃস্বার্থ ভালোবাসার উদাহরণ কম হলেও তার অস্তিত্বকে উপেক্ষা করা যায় না। আর এই ঋণাত্মকতার যুগে এইধরনের সংবাদগুলোই জীবনমুখী করে তোলে আমাদের।

সম্প্রতি পরিচালক প্রভাত রায়ের প্রত্যাবর্তনের খবর পেয়ে গিয়েছেন অনেকেই। সেই খবরে খুশী বাংলার আপামর চলচ্চিত্রপ্রেমী। কিন্তু এত খুশী, আনন্দের পিছনে কঙ্কালের মত লুকিয়ে রয়েছে একটা নির্মম সত্য, আরো ভাল করে বলতে গেলে ‘ডার্ক ট্রুথ’। সেই যে, মান্না দে গেয়েছিলেন, ‘শিল্পের জন্যই শিল্পী শুধু…!’ বিষয়টা অনেকটা বোধহয় সেইরকমই। যে মানুষটার হাত থেকে বেরিয়েছিল ‘লাঠি, ‘শ্বেতপাথরের থালা’র মত ছবি, যে মানুষটা তৈরী করেছিলেন ‘প্রতিকার’, ‘পাপী’, ‘প্রতীক’-এর মত ছবি, তাঁর দুঃসময়ে পাশে দাঁড়ানোর জন্য এগিয়ে আসেননি কেউই। এ নিয়ে আক্ষেপও ছিল বর্ষীয়ান এই পরিচালকের। জানিয়েছিলেন, প্রায় ১৫জন ছেলেমেয়ে ইন্ডাস্ট্রিতে এসেছিল তাঁর হাত ধরে। অথচ ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত, টোটা রায়চৌধুরী এবং সায়ন্তিকা ছাড়া কেউই মনে রাখেনি তাঁকে। কিন্তু এত না পাওয়ার মধ্যেও জীবন যে তাঁর জন্য সাজিয়ে রেখেছিল সারপ্রাইজ, কিছুদিন আগে পর্যন্তও ভাবতে পারেননি তিনি।

গ্রাফিক ডিজাইনার একতা, একতা ভট্টাচার্য। বিগত দশ বছর ধরে, টলিপাড়ার বিভিন্ন সিনেমা ও বিজ্ঞাপনের পাবলিসিটি ডিজাইন করে আসছে তাঁর কোম্পানি ‘Ekta Creative Tales’। ছোটবেলায়, যে বয়সে মানুষের মন ডানা মেলে ফ্যান্টাসির জগতে, সেই বয়স থেকেই পরিচালক প্রভাত রায়ের ছবির ভক্ত ছিলেন তিনি। ভক্ত ছিলেন তাঁর ‘স্মার্ট, বম্বে-স্টাইল পরিচালনা’র। কিন্তু স্বাভাবিকভাবেই, ব্যক্তিগতস্তরে তখন তাঁর পরিচয় ছিল না পরিচালকের সঙ্গে। ২০১৯-’২০ সাল নাগাদ, সমস্ত সঙ্কোচ, জড়তা কাটিয়ে তিনি পরিচালক প্রেমেন্দু বিকাশ চাকীর সাহায্যে প্রথম দেখা করেন তাঁর আইডল-হিরো প্রভাত রায়ের সঙ্গে।

সেই দেখাটুকুই হয়ত ছিল এই সম্পর্কের ভিত্তিপ্রস্তর। এরপরে মহামারীর প্রকোপে, আর শহরে না থাকার দরুণ সামনাসামনি দেখা হয়নি বহুদিন। যোগাযোগের মাধ্যম ছিল সোশ্যাল মিডিয়াটুকু। ২০২২ সালে পরিচালক হারান তাঁর পঞ্চাশবছরের সঙ্গিনী, তাঁর স্ত্রীকে। আর তারপরেই অবসাদের অতলে তলিয়ে যেতে থাকেন তিনি। শহরে ফেরার দিনই, একটি ফেসবুক পোস্টে তাঁর অসুস্থতার কথা জানতে পেরে খোঁজখবর নিয়ে একতা পৌঁছে যান হাসপাতালে। ভিত্তিপ্রস্তরের উপর যেন অট্টালিকা গড়ার কাজ শুরু হল এবার। একতাকে দেখে দু’দিনে প্রথমবারের জন্য হাসি ফুটল প্রভাত রায়ের মুখে। আধাচেনা একটি মেয়েকে নিজের সন্তান ভাবতে শুরু করলেন পরিচালক। ‘স্যার’ থেকে হয়ে উঠলেন একতার ‘বাবি’।

মেয়েও যেন এইক’দিনে বড় হয়ে গিয়েছিলেন কিছুটা। পরিবারের সমর্থনে অবশেষে ‘বাবি’র দায়িত্ব নিলেন একতা। যে মানুষটি তিলে তিলে শেষ হয়ে যেতে বসেছিলেন, মৃত্যুর মুখ থেকে তাঁকে কেড়ে নিয়ে এলেন তাঁর মেয়ে। প্রভাত রায়ের সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে 71/1 MB-কে একতা বলেন, ‘What an absolute adorable father’! সম্প্রতি চলছে প্রভাত রায়ের আত্মজীবনী ‘ক্ল্যাপস্টিক’-এর কাজ। একতা জানান, ‘দু’জনে মিলেই চলছে লেখালেখির কাজ। বাবির ইচ্ছে ছিল যদি বই বেরোয়, তাহলে সেটা যেন আমি লিখি।’

সম্প্রতি একতার লেখা একটি অ্যাডফিল্মের চিত্রনাট্য ও সংলাপ লিখেছেন প্রভাত রায়। ইন্ডাস্ট্রির প্রতি একটা বিতৃষ্ণা জন্মে গিয়েছিল তাঁর। ছেড়ে দিয়েছিলেন সব কাজও। তাহলে ফের রাজী করালেন কীভাবে! একতা বলছেন, ‘ বাবি এর আগে কখনো বিজ্ঞাপনের জন্য কাজ করেননি। এবারেও প্রথমে রাজী হননি বাবি। কিন্তু আল্টিমেটলি আমার কোনো কথাই ফেলতে পারেন না উনি।’ এতদিন পরে কাজে ফিরেও, বরাবরের মতই সেই আবেগ এবং মায়াজড়ানো সংলাপে ফ্লোর মাতিয়েছেন পরিচালক।

অনেকেই ভেবেছিলেন, হয়ত ফুরিয়ে গিয়েছেন প্রভাত রায়। অপত্যস্নেহে কখনোই হয়ত জড়িয়ে ধরতে পারবেন না কাউকে! কিন্তু কোথায় যেন বাঁধা থাকে এক অদৃশ্য সুতো। আশিবছরের গোড়ায় দাঁড়িয়ে সন্তান পেয়েছেন পরিচালক। হয়ে উঠেছেন বিশ্বের অন্যতম সুখী একজন বাবা।

ভালো থাকুন প্রভাত রায়, ভালো থাকুন একতা, ভালো থাকুক পৃথিবীর সব ভালবাসার সম্পর্কগুলো!

Author

  • Debasmita Biswas

    বেথুন কলেজ থেকে উদ্ভিদবিদ্যায় স্নাতক। পড়ার নেশা ছোট থেকে, প্রাথমিকভাবে লেখালেখির শুরু শখেই। তারপর সংবাদপত্র, পত্র-পত্রিকায় সমালোচনা পড়ার অভ্যাস আর বিভিন্ন নাটক, সিনেমা দেখার পর বিশ্লেষণ করার শখ থেকেই ইচ্ছে সমালোচক হওয়ার। বিনোদনজগতের বিভিন্ন খবর করার পাশাপাশি নাটক এবং সিনেমা দেখে তার গঠনমূলক সমালোচনাও করেন তিনি।

Scroll to Top